সত্যের সাক্ষ্য
[এটি মাওলানা মওদূদীর (রঃ) একটি ভাষণ। ১৯৪৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর লাহোর জামায়াতে ইসলামীর সম্মেলনে তিনি এ ভাষণ দেন। শিয়ালকোট সংলগ্ন মুরাদপুরে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়।]

সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার, যিনি নিখিল বিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, মালিক এবং শাসক। যিনি অসীম জ্ঞান, অনুগ্রহ ও ক্ষমতা বলে এই বিশ্বজাহান পরিচলনা করেছেন। যিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করে তাকে দান করেছেন জ্ঞান ও বিবেক- বুদ্ধির ন্যায় অমূল্য শক্তি আর সমাসীন করেছেন দুনিয়ায় তাঁর খিলাফাতের মর্যাদায়। যিনি মানুষের পথ প্রদর্শনের নিমিত্ত যুগে যুগে নবীদের মারফতে নাযিল করেছেন কিতাবসমূহ।

আল্লাহর করুণারাশি বর্ষিত হোক তাঁর সে সব সম্মানিত ও নেক বান্দাদের উপর যাঁরা দুনিয়ায় এসেছিলন মানুষকে প্রকৃত মানুষ্যত্ব শেখাতে, যারা মানুষকে তার জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে গেছেন, আর বাতলে দিয়েছেন তার জীবন যাপনের সঠিক পদ্ধতি। আজ দুনিয়ায় যা কিছু হিদায়াতের আলো, নৈতিক পবিত্রতা, পুণ্য ও পরহিযগারীর নিদর্শন দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে আল্লাহর এ নেক বান্দাদেরই পথ- নির্দেশের ফল। দুনিয়ার মানুষ কখনো তাঁদের এ অনুগ্রহের কথা ভুলতে পারবে না।

প্রিয় বন্ধুগণ, আমরা আমাদের সম্মেলনগুলোকে দু’ টো অংশে ভাগ করে থাকি। একাংশে আমরা পরস্পর বসে আপন কাজ কর্ম যাচাই-পর্যালোচনা করি এবং তাকে আরো সামনে এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ করে থাকি। আর দ্বিতীয়াংশে আমরা সম্মেলন স্থানের সাধারণ অধিবাসীদের কাছে দাওয়াত পেশ করে থাকি। আজকের এ সম্মেলন শেষোক্ত উদ্দেশ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমরা কোন বস্তুর দিকে লোকদের আহবান জানিয়ে থাকি অথবা আমাদের দাওয়াত কি, এ কথাটুকু বলার জন্যেই আমরা আপনাদেরকে এখন কষ্ট দিচ্ছি।

আমাদের দাওয়াত
আমাদের দাওয়াত হচ্ছে যারা প্রথমত: বংশগত মুসলমান এবং দ্বিতীয়ত: মুসলমান নয় এমন সব মানবগোষ্ঠীর প্রতি। এদের প্রত্যেকের জন্যই আমাদের কাছে বিশেষ পয়গাম রয়েছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, এখানে শেষোক্ত দলের লোকদেরকে আমি দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের অতীতের ভুল ও বর্তমান অবস্থার ফলেই মানব জাতির এক বিরাট অংশ আমাদের থেকে দূরে সরে গেছে। এমতাবস্থায় তাদের ও আমাদের মহান প্রভু আমাদের পথ প্রদর্শনের জন্য নবীদের মারফত যে পয়গাম পাঠিয়েছিলেন, তাকে তাদের কাছে পৌছানোর সুযোগ আমরা খুব কমই পেয়ে থাকি। যা হোক, তারা এখানে উপস্থিত নেই বলে মুসলমানদের জন্যে দাওয়াতের দির্দিষ্ট অংশকেই আমি এখানে পেশ করবো। মুসলমানদের আহবান হচ্ছে এই যে, মুসলমান হিসেবে তাঁদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য ন্যস্ত হয়, তা তারা পুরোপুরি অনুধাবন ও পালন করুন।

আমরা মুসলিম, আমরা আল্লাহ ও তার দীনকে মেনে নিয়েছি, কেবল এটুকু কথা বলেই আপনারা দায়িত্বমুক্ত হতে পরেন না। বরং আপনাদের এ চেতনাও থাকতে হবে যে, যে মুহূর্তে আপনারা আল্লাহকে আপন প্রভু এবং তাঁর দীনকে নিজেদের জীবন বিধান বলে মেনে নিয়েছেন ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আপনাদের উপর এক বিরাট দায়িত্বও এসে পড়েছে। পরন্তু সে দায়িত্ব পালনের পান্থা কি, সে সম্পর্কে আমাদেরকে চিন্তা ভাবনা করতে হবে। কারণ, এতে আপনারা ব্যর্থকাম হলে আপনাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই ব্যর্থ হয়ে যাবে। এর মন্দ পরিণতি থেকে আপনারা কোথাও রেহাই পাবেন না।

মুসলমানের দায়িত্ব
সে দায়িত্বটা কি? তা শুধু আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতা, তার কিতাব, তার রাসূল ও পরকালের প্রতি আপনাদের ঈমান আনা নয় অথবা তা শুধু আপনাদের নামায পড়া, রোযা রাখা, যাকাত দেয়া এবং হজ্জ করার ব্যাপারেও নয়, কিংবা তা বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে কিছুটা ইসলামী বিধান মেনে নেয়াও নয়, বরং এ সবের উর্ধ্বে এক বিরাট দায়িত্ব আপনাদের উপর ন্যস্ত হয়ে থাকে। তা হচ্ছে এই যে, যে মহান সত্যের উপর আপনারা ঈমান এনেছেন, তার সাক্ষীরূপে সারা দুনিয়ার সামনে আপনাদেরকে দাঁড়াতে হবে।

কুরআন মজীদে ‘মুসলমান’ নামে আপনাদেরকে একটি স্বতন্ত্র জাতির মর্যাদা দেয়া হয়েছে।এর একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, আপনারা সমস্ত মানুষের সামনে পুরোপুরি সত্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবেন।

وكذلك جعلناكم امة وسطا لتكونوا شهداء على الناس ويكون الرسول عليكم شهيدًا .

“আমি তোমাদেরকে এক মধ্যমপন্থী জাতি বানিয়েছি যাতে করে তোমরা লোকদের জন্যে সাক্ষী হও আর রাসূলও যেন তোমাদের জন্যে সাক্ষী হন।” (সূরাআল বাকারাহ-১৪৩)

জাতি হিসেবে এ হচ্ছে আপনাদের আবির্ভাবের একমাত্র উদ্দেশ্য।।এ উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে না পারলে আপনাদের জীবন বৃথাই শেষ হয়েছে বলতে হবে। এ দায়িত্ব বস্তুত আল্লাহর পক্ষ থেকেই আপনাদের উপর অর্পিত হয়েছে।

আল্লাহর হুকুম হচ্ছে-

يايها الذين امنوا كونوا قومين بالقسط شهداءلله

হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর জন্যে সত্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াও।” (সুরা আন নিসা-১৩৫)

এ নিছক নীতিকথা নয়, বরং এ হচ্ছে কড়া নির্দেশ। আল্লাহ বলেন-

ومن اظلم ممن كتم شهادة عنده من الله .

“যার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন সাক্ষ্য বর্তমান রয়েছে, সে যদি তা গোপন রাখে, তবে তার চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে? (সুরা বাকারা-১৪০)

অতঃপর এ দায়িত্ব পালন না করার ভীষণ পরিণতির কথাও আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আপনাদের পূর্বে ইহুদী জাতিকে এ সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল। কিন্তু তারা সত্যের কিছুটা গোপন আর কিছুটা তার বিপরীত সাক্ষ্যদান করেছিল। এমনিভাবে তারা সামগ্রিকভাবে সত্যের পরিবর্তে বাতিলের সাক্ষীতে পরিণত হয়ে গেল।

ফলে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে এক প্রচন্ড আঘাত দিয়ে সরিয়ে দিলেন এবং তাদের অবস্থা এ দাঁড়ালো যে,

وضربت عليهم الذلة والمسكنة وباءو بغضب من الله.

“লাঞ্ছনা- গঞ্জনা, অপমান, অধঃপতন ও দুরবস্থা তাদের উপর চেপে বসলো এবং তারা আল্লাহর গযবে পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লো।” (সুরা আল-বাকারা-৬১)

সত্যের সাক্ষ্য
আপনাদের উপর এই যে সাক্ষ্যদানের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে এর অর্থ হচ্ছে এই যে, আপনাদের কাছে যে সত্য এসেছে, যে সত্য আপনাদের কাছে উদ্ভাসিত হয়েছে, সত্যতা ও যথার্থতা সম্পর্কে এবং তার সরল-সোজা পথ হওয়া সম্বন্ধে আপনারা দুনিয়ার সামনে সাক্ষ্য দান করবেন। এমনি সাক্ষ্য দিবেন যেন সত্যতা যথার্থরূপেই প্রতিপন্ন হয় এবং দুনিয়ার মানুষের সামনে আল্লাহর দীনের চুড়ান্ত প্রমাণও প্রকাশ হয়ে পড়ে। বস্তুত সত্যের এমনি সাক্ষ্য দানের জন্যেই যুগে যুগে নবীগণের আবির্ভাব হয়েছিল। আর এ দায়িত্ব পালন করা ছিল তাঁদের অপরিহার্য কর্তব্য। নবীদের অবর্তমানে এ দায়িত্ব এসে পড়েছে সম্মিলিতভাবে সমগ্র মুসলিমজাতির উপর।

সাক্ষ্য দানের গুরুত্ব
এ সাক্ষ্যদানের গুরুত্ব আপনারা এথেকে অনুধাবন করতে পারেন যে, এর ভিত্তিতেই আল্লাহ তাআলা মানুষের হিসাব – নিকাশ এবং পুরস্কার বা শাস্তিদানের ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তাআলা মহাজ্ঞানী, মেহেরবান এবং ইনসাফের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর অগাধ জ্ঞান, অসীম অনুগ্রহ ও ন্যায় বিচারের কাছ থেকে এটা আশা করা যেতে পারে না যে, মানুষ তার ধর্মীয় কথা জানতে পারবে না অথচ তার বিপরীত পথে চলার অপরাধে তিনি তাকে পাকড়াও করবেন। মানুষ সরল- সোজা পথের কথা জানবে না অথচ সে পথে না চলার দরুন তাকে ধরে তিনি শাস্তি দেবেন। বস্তুত কোন বস্তুটি সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে, তা মানুষের অজ্ঞাত থাকবে আর তার কাছ থেকে সে সম্পর্কেই জবাব চাওয়া হবে, এটা কিছুতেই হতে পারে না। এ জন্যেই আল্লাহ তাআলা প্রথম মানুষকেই একজন নবীরূপে সৃষ্টি করেন। অতঃপর মানুষকে তাঁর মরযী ও দুনিয়ার জীবন যাপনের নির্ভুল পদ্ধতি শেখানোর জন্যে যুগে যুগে আরো অসংখ্য নবী পাঠিয়েছেন। তাঁরা মানুষকে এ শিক্ষা দিয়ে গেছেন যে, দেখো,এ পথে তোমরা প্রকৃত মালিকের সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে। আর এগুলো হচ্ছে বর্জনীয় এবং এসব জিনিস সম্পর্কে তোমাদের জবাবদিহি করতে হবে, ইত্যাদি।

চূড়ান্ত প্রচেষ্টা
আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীদের দ্বারা এসব সাক্ষ্যই দান করান। পবিত্র কুরআনে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে-

رسلا مبشرين ومنذرين لئلا يكون للناس على الله حجة بعد الرسل ط وكان الله عزيزا حكيما .

অর্থাৎ “আল্লাহ তাআলা নবীদেরকে সুসংবাদ প্রদানকারী এবং পরিণতির ভীতি প্রদর্শনকারী রূপে পাঠিয়েছেন, যাতে করে মানুষ তাঁর কাছে এরূপ বিতর্ক তোলার সুযোগ না পায় যে, আমরা তো বে-খবর ছিলাম। আর আল্লাহ সর্বাবস্থায়ই প্রবল পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আন নিসাঃ ১৬৫)

এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা মানুষকে সতর্ককরণের দায়িত্ব নবীগণের উপর অর্পন করেন এবং তাঁরা এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের কাজে নিয়োজিত হন। আর তারা যথার্থরূপে সাক্ষ্যদানের দায়িত্ব পালন করলে লোকেরা নিজ নিজ কৃতকর্মের জন্যে নিজেরাই দায়ী হতে পারে। আর যদি তাদের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দানের দায়িত্ব পালনে ক্রটি হয়, তবে সাধারণ মানুষের গোমরাহীর জন্যে তাদেরকে পাকড়াও করা যেতে পারে। অন্য কথায় বলা যায়, নবীদের উপর অতি বিরাট ও সংকটপূর্ণ দায়িত্ব অর্পন করা হয়েছিল। আর তা ছিল এই যে, হয় তাঁদেরকে যথার্থরূপে সত্যের সাক্ষ্য দান করে মানুষের কাছে সত্যকে চূড়ান্তরূপে প্রকাশ করতে হতো অথবা তাদেরকে সাধারণ মানুষের এ অভিযোগের সম্মুখীন হতে হতো যে, আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে যে তত্ত্বজ্ঞান দান করেছিলেন আপনারা তা আমাদের কাছে সরবরাহ করেননি। জীবন যাপনের যে সঠিক পদ্ধতি তিনি আপনাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আমাদেরকে তা শিখিয়ে দেননি। এ কারণেই নবীগণ এ দায়িত্বের গুরুত্ব তীব্রভাবে অনুভব করতেন। আর এ কারণেই তাঁরা সত্যের সাক্ষ্য দানের দায়িত্ব পালনে এবং মানুষের কাছে সত্যকে চুড়ান্তরূপে প্রমাণ করতে প্রাণান্তকর চেষ্টা করে গেছেন।

জবাবদিহি
অতঃপর নবীদের মাধ্যমে যারা জ্ঞান ও হিদায়াতের পথ পেয়েছেন, তারাই একটি উম্মত বা জাতিতে পরিণত হয়েছে। নবীদের উপর সত্যের সাক্ষ্যদানের যে দায়েত্ব অর্পিত ছিল, তাঁদের অবর্তমানে তা উম্মতের উপর এসে পড়লো। তারাই এখন নবীদের উত্তরাধিকারীর মর্যাদায় অভিষিক্ত হলো। এখন যদি তারা সত্যের সাক্ষ্যদানের দায়িত্ব যথাযথরূপে পালন করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ সত্যপন্থী না হয়, তবুও তারা পুরস্কৃত হবে এবং সাধারণ মানুষ আল্লাহর দরবারে অপরাধী সাব্যস্ত হবে। কিন্তু তারা যদি সত্যের সাক্ষ্যদানের কোনরূপ অবহেলা প্রদর্শন করে অথবা সত্যের পরিবর্তে অসত্যের বা বাতিলের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়, তবে লোকদের আগে তারাই ধরা পড়েবে। তারা নিজেদের কার্যাবলী সম্পর্কে তো জিজ্ঞাসিত হবেই তদুপরি সাক্ষ্যদানে তাদের অবহেলার অথবা মিথ্যা সাক্ষ্যদান করার দরুন যারা গোমারাহী, বিপর্যয় ও ভ্রান্তির পথে চলেছে, তাদের কার্যাবলী সম্পর্কেও তাদের জবাবদিহি করতে হবে।


পিডিএফ লোড হতে একটু সময় লাগতে পারে। নতুন উইন্ডোতে খুলতে এখানে ক্লিক করুন।




দুঃখিত, এই বইটির কোন অডিও যুক্ত করা হয়নি